🧪 সুষম পুষ্টি ও সার নির্দেশিকা

ধানের সর্বোচ্চ ফলনে
সুষম সার প্রয়োগ ব্যবস্থাপনা

বোরো, আমন ও আউশ ধানের জমিতে সঠিক অনুপাতে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি, এমওপি, জিপসাম ও দস্তা সার ব্যবহারের বৈজ্ঞানিক নিয়ম ও প্রয়োগ সময়সূচি।

মৌসুমভিত্তিক মাত্রা

মৌসুম অনুযায়ী সারের আনুমানিক চাহিদা (প্রতি শতাংশে)

মাটির ধরন ও উর্বরতার ওপর ভিত্তি করে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে মাত্রা সমন্বয় করুন।

☀️

বোরো ধান

দীর্ঘমেয়াদী জাত হওয়ায় সারের চাহিদা বেশি। ইউরিয়া ৩ কিস্তিতে এবং অন্যান্য সার শেষ চাষের সময় দিতে হয়।

ইউরিয়া ১০০০-১২০০ গ্রাম | টিএসপি/ডিএপি ৪০০-৫০০ গ্রাম
🌧️

রোপা আমন ধান

বৃষ্টির কারণে অতিরিক্ত ইউরিয়া লিচিং হতে পারে, তাই পরিমিত প্রয়োগ ও কিস্তির ব্যবধান বজায় রাখুন।

ইউরিয়া ৭০০-৮০০ গ্রাম | টিএসপি/ডিএপি ৩০০-৩৫০ গ্রাম
🌱

আউশ ধান

স্বল্পমেয়াদের ফসল। চারা দ্রুত বেড়ে ওঠার জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি।

ইউরিয়া ৬০০-৭০০ গ্রাম | টিএসপি/ডিএপি ২৫০-৩০০ গ্রাম
ধাপে ধাপে নির্দেশনা

সার প্রয়োগের সঠিক সময় ও পদ্ধতি

সারের অপচয় রোধ ও কার্যকারিতা বাড়াতে সঠিক ধাপে সার প্রয়োগ করুন।

🚜

১. জমি তৈরির শেষ চাষের সময় (মৌলিক সার)

গাছের প্রাথমিক শিকড় বিস্তার ও মজবুত কাঠামোর জন্য জমি তৈরির শেষ চাষে সার প্রয়োগ করুন।

  • সম্পূর্ণ টিএসপি/ডিএপি, জিপসাম, দস্তা ও বোরন জমি তৈরির শেষ চাষে ছিটিয়ে মাটির সাথে মেশান।
  • এমওপি সারের অর্ধেক বা দুই-তৃতীয়াংশ শেষ চাষে দিন।
  • জৈব সার বা গোবর জমি তৈরির শুরুর দিকেই প্রয়োগ করে মিশিয়ে দিন।
🌱

২. প্রথম কিস্তি ইউরিয়া (চারা প্রতিষ্ঠা পর্যায়)

চারা মাটিতে শিকড় গেড়ে সবুজ বর্ণ ধারণ করলে প্রথম কিস্তির ইউরিয়া প্রয়োগ করুন।

  • রোপণের ১৫-২০ দিন পর (কুশি আসার প্রারম্ভে) মোট ইউরিয়ার ১/৩ অংশ প্রয়োগ করুন।
  • সার প্রয়োগের সময় জমিতে পাতলা পানি (১-২ ইঞ্চি) রাখুন, অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন করুন।
  • আগাছানাশক বা নিড়ানি দেওয়ার পরেই সার প্রয়োগ করুন।
🌿

৩. দ্বিতীয় কিস্তি ইউরিয়া (সর্বোচ্চ কুশি পর্যায়)

অধিক কার্যকর কুশি এবং ফলনশীল শিষ বৃদ্ধির জন্য এ কিস্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

  • রোপণের ৩০-৩৫ দিন পর (জাতের মেয়াদ অনুযায়ী) দ্বিতীয় কিস্তি ইউরিয়া দিন।
  • হালকা দোআঁশ মাটিতে এ সময়ে বাকি থাকা এমওপি (পটাশ) সারের অংশ প্রয়োগ করা ভালো।
  • দুপুরে কড়া রোদ বা পাতার ওপর শিশির/বৃষ্টির পানি থাকলে ইউরিয়া ছিটাবেন না।
🌾

৪. তৃতীয় কিস্তি ইউরিয়া (কাইচ থোড় পর্যায়)

ধানের শিষ বের হওয়ার ৫-৭ দিন আগে পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিত করতে শেষ কিস্তি দেওয়া হয়।

  • কাইচ থোড় আসার লক্ষণ দেখা দিলে বাকি ১/৩ অংশ ইউরিয়া উপরিপ্রয়োগ করুন।
  • গাছে অতিরিক্ত ঘন সবুজ রঙ বা ব্লাস্ট/পাতাপোড়া রোগের লক্ষণ থাকলে ইউরিয়া বন্ধ রাখুন।
  • শিষ বের হয়ে যাওয়ার পর কখনোই জমিতে ইউরিয়া ছিটাবেন না।
🟩

৫. গুটি ইউরিয়া ও এলসিসি (LCC) প্রযুক্তি

ইউরিয়া সারের সাশ্রয় এবং অপচয় কমাতে আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করুন।

  • গুটি ইউরিয়া ব্যবহারে সাধারণ ইউরিয়ার তুলনায় ২৫-৩০% সার সাশ্রয় হয় এবং ফলন বৃদ্ধি পায়।
  • লিফ কালার চার্ট (LCC) ব্যবহার করে পাতার রঙের সাথে মিলিয়ে চাহিদা অনুযায়ী ইউরিয়া দিন।
  • ডিএপি ব্যবহার করলে সেই অনুপাতে ইউরিয়ার পরিমাণ কমিয়ে সমন্বয় করুন।
প্রধান খাদ্যোপাদান

সারের কার্যকারিতা ও গুরুত্ব

ফসলের কোন সার কী কাজে লাগে তা জেনে পরিমিত ব্যবহার করুন।

🍃

নাইট্রোজেন (ইউরিয়া)

গাছের দ্রুত দৈহিক বৃদ্ধি, কুশির সংখ্যা বাড়ানো এবং পাতার সবুজ ক্লোরোফিল গঠনের জন্য অপরিহার্য উপাদান।

অতিরিক্ত প্রয়োগে রোগবালাই বাড়ে ও গাছ হেলে পড়ে
🪴

ফসফরাস (টিএসপি/ডিএপি)

মূল বা শিকড় মজবুত করে, দ্রুত চারা প্রতিষ্ঠা করে এবং সময়মতো সুস্থ শিষ ও ফুল ফোটাতে সহায়তা করে।

সব সময় জমি তৈরির শেষ চাষে দিতে হয়
🛡️

পটাশিয়াম (এমওপি)

গাছের কাণ্ড শক্ত করে, খরা ও রোগবালাই প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ধানের দানা পুষ্ট ও চকচকে করে।

ফলন ও গুণগত মান নিশ্চিত করে
ঘাটতি শনাক্তকরণ

পুষ্টি উপাদানের অভাবজনিত লক্ষণ

লক্ষণ দেখে বুঝুন কোন পুষ্টির অভাব হয়েছে এবং দ্রুত প্রতিকার নিন।

পুরনো পাতা হলুদ

🍂 নাইট্রোজেনের ঘাটতি

নিচের দিকের পুরনো পাতা প্রথমে হালকা হলুদ হয়ে শুকিয়ে যায়, গাছের বৃদ্ধি থমকে যায় এবং কুশি কম হয়। প্রতিকারে অনুমোদিত মাত্রায় ইউরিয়া উপরিপ্রয়োগ করুন।

পাতার কিনারা পোড়া

🍁 পটাশিয়ামের ঘাটতি

পুরনো পাতার ডগা ও কিনারা তামাটে বা পুড়ে যাওয়ার মতো বাদামি রং ধারণ করে। কাণ্ড দুর্বল হয়ে হেলে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

পাতায় মরচে দাগ

🌾 দস্তার (জিংক) ঘাটতি

রোপণের ২-৩ সপ্তাহ পর পাতার গোড়া বা মধ্যভাগে বাদামি মরচে পড়ার মতো ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায় এবং বৃদ্ধি থেমে যায়। জিঙ্ক সালফেট বা চিলেটেড জিংক স্প্রে করুন।

⚠️ সার ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

ডিএপি (DAP) সার ব্যবহার করলে তাতে নাইট্রোজেন বিদ্যমান থাকে, বিধায় ইউরিয়া সার অন্তত এক-তৃতীয়াংশ কম প্রয়োগ করতে হবে। দস্তা (জিংক) এবং টিএসপি/ডিএপি সার একসাথে মিশিয়ে প্রয়োগ করবেন না; এতে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় উভয় সারের কার্যকারিতা নষ্ট হয়। জমিতে সার উপরিপ্রয়োগের সময় পর্যাপ্ত কিন্তু সহনশীল আর্দ্রতা নিশ্চিত করুন।

সারের মাত্রা নির্ধারণে সাহায্য চান?

আপনার জমির আয়তন, অঞ্চল ও ধানের জাতের নাম লিখে কৃষি কর্মকর্তার সরাসরি পরামর্শ পেতে যোগাযোগ করুন।

কৃষি পরামর্শ নিন →